শুক্রবার   ০৩ এপ্রিল ২০২০   চৈত্র ১৯ ১৪২৬   ০৯ শা'বান ১৪৪১

৫৯৪

মন্ত্রীরা যেন ইশতেহার মেনেই কাজ করেন

প্রকাশিত: ৭ জানুয়ারি ২০১৯  

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর সবার আলোচনা ও আগ্রহ ছিল নতুন মন্ত্রিসভায় কারা আসছেন, তা নিয়ে। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ বলেছিলেন, নতুন মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের চমক থাকবে। শেষমেশ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৪৭ জনের যে মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা সবাইকে অবাক করেছে। নতুন মন্ত্রিসভা কেমন হলো, তা নিয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তিন বিশেষজ্ঞ এম হাফিজউদ্দিন খানসুলতানা কামাল ও আলী ইমাম মজুমদার

এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন , মন্ত্রীরা যেন ইশতেহার মেনেই কাজ করেন 
মন্ত্রিসভায় সত্যিই বিরাট চমক দেখতে পেলাম। অনেক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বাদ পড়েছেন। অনেককে মন্ত্রী করা হয়েছে, যাঁরা হয়তো এবার নির্বাচনই করেছেন জীবনে প্রথম। যাঁরা ঠিকমতো মন্ত্রণালয় চালাতে পারেননি, তাঁদের কথা না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু যাঁরা ভালো করেছেন, তাঁরাও কেন বাদ পড়লেন, ঠিক বোঝা গেল না। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীই ভালো বুঝবেন, কোন মন্ত্রী এযাবৎ কেমন দক্ষতা দেখিয়েছেন। 

যেহেতু মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েই গেল, আমাদের চাওয়া হচ্ছে এখন নির্বাচনী ইশতেহার মেনে সব মন্ত্রীই যেন কাজ করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্য গণতন্ত্র। গণতন্ত্র তো নেই। আইনের শাসন তো নেই। তারপরও আমরা চাইব, মন্ত্রীরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের ব্যাপারে ভূমিকা রাখবেন। আওয়ামী লীগের এবারের ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানোর কথা বলা আছে। এই কথার ওপর কতটুকু আস্থা রাখা যাবে তা নির্ভর করবে নতুন মন্ত্রিসভা আগামী সময়ে কী করবে, তার ওপর। হতাশ হই, আগের ইশতেহারে বলা হয়েছিল, মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করা হবে। কাজটি আর হয়নি।

এম হাফিজউদ্দিন খান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।

সুলতানা কামালপ্রত্যাশা শান্তিপূর্ণ নিরাপদ জীবন
নতুন মন্ত্রিসভার সবাইকে শুভেচ্ছা। তরুণদের মন্ত্রিসভায় আসা আশাব্যঞ্জক বটে, এই অর্থে তাঁরা নতুন চিন্তাভাবনা নিয়ে আসবেন। তাঁরা নতুনভাবে বিশ্বকে দেখেন। উন্নয়নের পর্যায়ক্রমিক ধারাগুলোর সঙ্গে তাঁরা নিজেদের অনেক সহজে খাপ খাওয়াতে পারেন। এসব কারণে তাঁদের সুযোগ থাকে প্রচুর। তবে যেহেতু তাঁদের আগে কখনো এ রকম দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি, তাই একটা ভাবনাও থাকে, তাঁরা কেমন ভূমিকা রাখবেন। 

পুরোনোদের মধ্যে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের কয়েকজন তো ভালো। সেই সময় তাঁরা ভালো ভূমিকা রেখেছিলেন, এখনো ভালো ভূমিকা রাখবেন বলে আশা রাখি। কয়েকজন সম্পর্কে প্রশ্ন ছিল, তাঁরা কোন বিবেচনায় এলেন? তবে প্রধানমন্ত্রী আগেও বলেছেন, অতীতের ভুলগুলো শুধরে ওঠার চেষ্টা করবেন। 

সামগ্রিকভাবে আমাদের প্রত্যাশা শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সম্মানজনক একটা জীবন পাওয়ার, অর্থাৎ আমাদের সংবিধানে যা আছে। আমাদের প্রত্যাশা, এমন একটা সমাজ, যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার থাকবে। আশা করছি, এমন সমাজ নিশ্চিত করবেন তাঁরা। 

আগে যখন (সরকারের) সমালোচনা হতো তখন আমরা প্রায়ই একটা ভাষ্য পেতাম যে অন্যদের কারণে তাঁরা কিছু করতে পারছেন না। তাঁরা এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এসেছেন। তাঁদের কাজ, চিন্তা, নীতি বাধাগ্রস্ত করতে পারেন এ রকম কোনো শক্তি নেই। আশা করছি, তাঁরা ইশতেহারে যে কথা বলেছেন, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন। তরুণ যাঁরা এসেছেন, তাঁরা নির্বাচনের যে অঙ্গীকার করে এসেছেন, সেটি যেন বাস্তবায়িত হয়। 

একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে যে বিষয়টা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বিগত সময়ে মানবাধিকার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে আমাদের সুনাম সে রকমভাবে রক্ষিত হয়নি। আমরা আশানুরূপ ভূমিকা রাখতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক হিসেবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া মন্ত্রিসভার কাছে প্রত্যাশা থাকবে যে তারা যেন প্রগতিবিরোধী, নারীবিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশলের অজুহাতে আপসকামী না হয়। 

 

মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আশা করি, যাঁদের পরিবারের সদস্যরা গুম হয়েছেন কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন, যেখানে মানুষ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন, সেই জায়গায় একটা পরিবর্তন আসবে। এঁদের ন্যায়বিচার দেওয়ার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন তাঁরা। 

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণও এ সরকারের ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। সেখানে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে। যদিও আমরা (দুর্নীতিতে) চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে বের হয়েছি, তবে এখনো দুর্নীতিতে ২৫ / ২৬ তম স্থান থেকে বের হতে পারিনি। এই জায়গায় আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। দুর্নীতি দমন নিয়ে আওয়ামী লীগ শক্ত বক্তব্য রেখেছে। আশা করব সেই অঙ্গীকার তারা যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করবে। 
সবশেষে আমি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন চাই।

সুলতানা কামাল: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা


আলী ইমাম মজুমদারসুশাসন নিশ্চিত করাই চ্যালেঞ্জ 
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের অধিকাংশই নতুন। এটা এক অর্থে ইতিবাচক। কেননা, পুরোনোদের তো নতুনদের জায়গা করে দিতে হবে। নয়তো নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে না। কিন্তু তাই বলে অভিজ্ঞ ও পুরোনোদের বেশির ভাগকে একদম বাদ দিয়ে দেওয়াটাকে আমি সঠিক মনে করি না। আগের মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞ ও জাতীয়ভাবে পরিচিত নেতাদের কয়েকজনকে নতুন মন্ত্রিসভায় রাখা যেত। সরকার পরিচালনার জন্য তাঁদের মতামত ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো যেত। মন্ত্রিসভায় না রাখলে তা করা কঠিন। 
 

সরকারের সামনের দিনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা। দেশের আর্থিক খাতে নানা অনিয়ম ও শৃঙ্খলার অভাব বহুলভাবে আলোচিত। সরকারের হাতে অনেকগুলো বড় প্রকল্প চলমান আছে। সেগুলো শেষ করতে হবে। এ ছাড়া দুর্নীতিও সরকারের জন্য বড় সমস্যা। এটা দূর করতে হবে। দেশে একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, অন্যদিকে আয়বৈষম্য বাড়ছে। এতে দেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে অনেক সাবধানে ও সাহসের সঙ্গে এগোতে হবে। সেই পথে পুরোনো অভিজ্ঞ নেতা ও মেধাবী তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের দরকার হবে। 

নতুন সরকারের মন্ত্রীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তা হচ্ছে, দক্ষতা ও সততা। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানোর কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনের আওতায় রেখে কাজ করানো নিশ্চিত করাটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ নিয়ে সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এই প্রত্যাশা পূরণে নতুন মন্ত্রীদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

চাঁপাইনবাবগঞ্জ
এই বিভাগের আরো খবর